মাদক নির্মূলের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে পুলিশ

Spread the love

মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে মাদক নিমূর্লের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ। চিহ্নিত মাদক স্পটগুলো পুলিশের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদকের প্রাপ্তি এখন সহজলভ্য নয়। চলমান অভিযানে বেশকিছু মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যহৃত রয়েছে বলে জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপার টিএম মোজাহিদুল ইসলাম । সম্প্রতি তার নিজ কার্যালয়ে ঢাকা ক্রাইমের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এ তথ্য জানান তিনি। জনগণের নিরাপত্তা বিধান ও অপরাধ দমনের পাশাপাশি মাদক, চোরাচালান ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে কাজ করে যাচ্ছেন জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার জানান মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা গেলে মাদক নির্মূল করা সম্ভব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা ক্রাইম প্রতিবেদক ফারুক আহমেদ চৌধুরী।

ঢাকা ক্রাইম: মাদক নিয়ন্ত্রনের বিষয়টিকে পুলিশ কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে?
মোজাহিদুল ইসলাম : মাদক নিয়ন্ত্রনই নয় নির্মূলের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। আইন শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অন্যতম ম্যান্ডেট হচ্ছে মাদক নির্মূল। পুলিশ সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। চলমান অভিযানে হেরোইন, ইয়াবা, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের রেকর্ড পরিমান মাদকদ্রব্য উদ্ধার জেলা পুলিশ। মাদকবিরোধি চলমান অভিযানে ৬৮০টি মাদক মামলায় ৯২১ জনকে আটক ও ১৪৯৫টি গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করা হয়েছে। জেলার চিহ্নিত মাদক স্পটগুলো পুলিশের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদকের প্রাপ্তি এখন সহজলভ্য নয়।

ঢাকা ক্রাইম: মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কী উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?
মোজাহিদুল ইসলাম : কেবল মাদক উদ্ধার বা কতিপয় মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। এটাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে চাই। শুধু গ্রেফতার বা জেলহাজতে পাঠিয়ে, বিচার করে মাদক রোধ করা সম্ভব নয়। কারন, যতদিন আমাদের দেশে মাদকের চাহিদা থাকবে, ততদিন পর্যন্ত মাদকের বিস্তার বন্ধ করা যাবে না। চাহিদা বন্ধ করতে হলে পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সহযোগীতায় পাড়া মহাল্লায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি করা হচ্ছে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। জঙ্গি ইস্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতা রয়েছে। এ কারণে জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সফল। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মাদক নির্মূলে জনগণকে সম্পৃক্ত করা গেলে জঙ্গিবাদের মতো দেশ থেকে মাদকও নিশ্চিহ্ন করা যাবে। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম গঠন করা হয়েছে। মসজিদে ঈমামদের মাধ্যমে জুমআর নামাজে খুতবার পূর্বে মাদকবিরোধি আলোচনা হচ্ছে। মাদক বিরোধি সচেতনামূলক সভা, দেয়াল লিখন এবং কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মাদক বিরোধি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে জেলা পুলিশের কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে।

ঢাকা ক্রাইম: পুলিশ জনগণের বন্ধু, তবে দুরুত্ব কেনো?
মোজাহিদুল ইসলাম: ঐতিহাসিকভাবে পুলিশের সঙ্গে জনগণের একটা দূরত্ব ছিল। জনগণের মধ্যে পুলিশ ভীতি ছিল; এটা সঠিক । তবে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার লক্ষ্যে পুলিশ কাজ করছে। স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম গঠনের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষর্থীরাও এখন পুলিশের অংশ। তাছাড়া জেলা পুলিশের ফেসবুক পেইজে ২৭ হাজারেরও বেশি মানুষ সংযুক্ত রয়েছে। বর্তমানে পুলিশের সঙ্গে জনগণের তেমন কোন দূরত্ব নেই। জনগণ ও পুলিশ মিলে একসঙ্গে কাজ করার ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। পেশাগত সাফল্যের কারণে পুলিশ জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। জনগনের সত্যিকারের বন্ধু হিসেবেই কাজ করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ।

ঢাকা ক্রাইম: পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে কিছু বলবেন?
মোজাহিদুল ইসলাম: পুলিশের কাজের পরিধি ব্যাপক। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, নির্যাতিত মানুষের পাশে বন্ধুর মতো দাড়ানো এবং অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড করানো সবই মোকাবিলা করে পুলিশ । আইন শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পুলিশই মূল্যবান সেবা দিয়ে থাকে জনগনকে। যে কোন পেশাতেই ভালোর বিপরীতে মন্দ থাকে। তেমনি পুলিশের বিরুদ্ধেও পাশবিকতা, দুর্নীতি, উদাসীনতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার অভিযোগ আছে। তবে পুলিশও আইনের উর্ধে নয়। ব্যাক্তির দায় বা অপরাধ বাহিনী বহন করবে না। কোন পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তার দায় তাকেই বহন করতে হয়। বিগত দুই বছরে এ জেলায় ৪৩জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চাকুরীচ্যুতি , পদাবনতি এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের।

ঢাকা ক্রাইম: আপনাদের উপর রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপ রয়েছে কি?
মোজাহিদুল ইসলাম: চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের উপর রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপ নেই। ক্ষাতাসীন দলের নেতাকর্মী বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আমাদের প্রতি কখনো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেনি। প্রকৃতপক্ষে কোন এক সময় ক্ষামতাসীন দলের হয়ে লেজুড়বৃত্তি করা, নানান তদবির রক্ষাসহ ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আটকে ছিল পুলিশের হাত। সেসব কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল পুলিশের ভাবমূর্তি। তবে বর্তমান সময়ে পুলিশ নিজস্ব গতিতে আইন প্রয়োগ করতে পারে।

ঢাকা ক্রাইম: চাঁপাইনবাবগঞ্জের আর কোন সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ?
মোজাহিদুল ইসলাম: রাষ্ট্রিয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাসহ পুলিশের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গৃহ বিবাদকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। এ জেলায় বহু বিবাহ, নারী নির্যাতন , বাল্য বিবাহের ব্যপকতা রয়েছে। এরূপ সমস্যাগুলাকে চিহ্নিত করে প্রতিকারের জন্য নারী শিশু সেল গঠন করা হয়েছে।

ঢাকা ক্রাইম: আগামী নির্বাচনে পুলিশের ভুমিকা নিয়ে কিছু বলুন?
মোজাহিদুল ইসলাম: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অরাজকতা নিয়ন্ত্রনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। সারা দেশের মত চাঁপাইনবাবগঞ্জেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ এবং বিভিন্ন দাবী-দাওয়া নিয়ে রাজপথ বেশ উত্তপ্ত হতে পারে। এ বিষয়টিও আমাদের নজনদারির মধ্যে রয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানে থাকবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ। নির্বাচনকে ঘিরে নৈরাজ্য বা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে কঠোর হাতে তা দমন করা হবে।

ঢাকা ক্রাইম: আইন প্রয়োগে পুলিশের জন্য কোন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
মোজাহিদুল ইসলাম: দুর্গম চরাঞ্চলে আত্নগোপনে  থাকা আসামীদের গ্রেফতার কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ওয়ারেন্ট তামিলে অসুবিধায় পড়তে হয়। কাঁটাতার বিহীন অরক্ষিত সীমান্ত ও বীট খাটালের অনুমোদন থাকায় খুব সহজেই প্রবেশ করতে পারে মাদক আর অস্ত্র। মুলত বীট খাটালে কারণেই হুণ্ডি ব্যবসার ও জালটাকার ব্যপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হুণ্ডি কারবারিদের ধরতে যথাযথ আইন ও প্রযুক্তি না থাকায় এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্চেনা।
ঢাকা ক্রাইম: আপনাকে ধন্যবাদ।

মোজাহিদুল ইসলাম: ঢাকা ক্রাইমকেও ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ