পরকীয়া: ভাবিকে বিয়ে করতে ভাইকে হত্যা !

Spread the love
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ক্রাইম ডটকম: ভাবির সাথে দীর্ঘদিন পরকীয় প্রেমের পর নিজেদের সংসার করার পথের কাঁটা ভেবে আপন ভাইকে হত্যা করেছে ভাই নামের কলঙ্ক নিহতের ছোট ভাই। নিহতের নাম মনিরুজ্জামান মনির, আর হত্যাকারী ছোট ভাই আজমল হক মিন্টু। যাকে নিয়ে এমন নৃশংস ঘটনা তিনি নিহত মনিরের স্ত্রী কাজল রেখা।
গত ৮ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর বাড্ডা থানার সাঁতারকুলের মেরুল হিন্দুপাড়া শ্রীরাম মঙ্গলের বাড়ীর পাশের মাঠ থেকে ছুরিকাঘাতে নিহত এক অজ্ঞাত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়না তদন্তের জন্য মৃতদেহটি ঢাকা মেডিকেলে কলেজ মর্গে পাঠানো হয় এবং নিহতের ছোট ভাই মিন্টু মৃতদেহটি তার ভাই মনিরের বলে শনাক্ত করেন।
হত্যাকান্ডে নিজের সম্পৃক্ততাকে আড়াল করতে বড় ভাইয়ের হত্যার ঘটনায় মিন্টু নিজেই বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তিনি মামলায় অভিযোগ করে বলেন, ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে তিনি হত্যাকান্ডের শিকার হতে পারে বলে ধারণা করছেন।
ওই সময় তিনি বলেন, ফেনী যাওয়ার পথে গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকায় আসেন বড় ভাই মনিরুজ্জামান মনির (৩৫)। ঢাকায় তার ছোট ভাই মিন্টুর বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। ওই দিন রাত ১০টার দিকে স্ত্রী কাজল রেখার (৩০) সাথে তার মোবাইল ফোনে কথাও হয়। এরপর থেকে মনিরের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। এ সময় তিনি ভাইয়ের সন্ধানে বাড্ডা থানায় যোগাযোগও করেন। এরপরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে গিয়ে মনিরের গলাকাটা মৃতদেহ খুঁজে পায় মিন্টু।
কিন্তু পুলিশের তৎপরতায় বেড়িয়ে আসে আসল রহস্য, তদন্তে বেরিয়ে আসে ভাবির পরকীয়ার জেরে নিজেরা বিয়ে করতে মনিরকে হত্যা করে ছোট ভাই মিন্টু, প্ররোচিত করে তার স্ত্রী কাজল রেখা। পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে ভাড়াটে খুনিসহ তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন যাকে নিয়ে ঘটনা সেই নিহত মনিরের স্ত্রী কাজল রেখা। মিন্টুর দেয়া বিয়ের প্রস্তাবে উত্তরে কাজল বলেছিলো ‘বিয়ে করতে হলে তোমার ভাইকে সরিয়ে দিতে হবে।’ ভাবির কথা শুনে বড় ভাই মনিরকে হত্যা করতে তিন ভাড়াটে খুনির সাথে এক লাখ টাকায় চুক্তিও করে মিন্টু। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় ডেকে নিয়ে মনিরকে খুন করে মিন্টুর ভাড়াটে খুনিরা।
এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্্ঘাটনের পর পুলিশের পক্ষ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর শনিবার রাজধানীর গুলশানের ডিসি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক আহমেদ এই সব তথ্য জানান।
ঘটনা সম্পর্কে তিনি জানান, ক্লু-লেস এই মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ নিহত মনিরের স্ত্রী কাজলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ও নিজের জড়িত থাকার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন এবং ১৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার তাকে আদালতে পাঠানো হলে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিও দেন।!
জবানবন্দিতে কাজল বলেন, আট-নয় বছর পূর্বে বিয়ের পর মনিরের ভাই আজমল দিনাজপুরে তাদের বাসায় ছিলেন। সেখানে আজমল হক মিন্টু অসুস্থ হয়ে যান। তাকে সেবা করার সময় দেবরের সঙ্গে কাজলের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। এই ঘনিষ্ঠতা থেকে দুইজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর মিন্টু চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে আসে। মনিরও ফেনীতে চাকরীতে চলে যান। এরই মধ্যে মিন্টুর সাথে কাজলের প্রেমের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। এর কিছুদিন পর মিন্টু কাজলকে বিয়ে করতে চায়। মনির বেঁচে থাকলে এই বিয়ে সম্ভব নয় বলে তাকে জানায় কাজল। তবুও কাজলকে কয়েকবার বিয়ে করার কথা বলে মিন্টু। আবারও তাকে কাজল জানান মনির বেঁচে থাকতে তা সম্ভব নয়। এরপর আপন ভাই মনিরকে কীভাবে হত্যা করা যায়, ভাবিকে সে কথা জিজ্ঞাসা করে মিন্টু। কোরবানি ঈদের আগে এই হত্যার পরিকল্পনার কথা জানালে কাজল এতে রাজি হয়নি। তখন থেকেই উভয়ে মিলে মনিরকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করে।
কাজল আরো বলেন, মিন্টু তার ভাইকে হত্যার জন্য এক লাখ টাকায় ভাড়াটে খুনি ঠিক করে। অগ্রিম হিসেবে ৩৩ হাজার টাকাও দেয়া হয় খুনিকে। পরিকল্পনা ছিল, ঈদের সময় দিনাজপুরে আসার পথে ঢাকায় মনিরকে হত্যা করা হবে। তখন তা সম্ভব হয়নি। ঢাকায় নিজের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখার কথা বলে মনিরকে ফোনে ডেকে আনে মিন্টু। ঢাকায় তার বাসায় যাওয়ার কথা বলে দিনাজপুরে থেকে ৭ সেপ্টেম্বর রওনা হন মনির। রাত ১০টার দিকে গ্রামীণফোনের সিমে স্বামীর সাথে কথা বলে কাজল। অন্যদিকে, আরেকটি সিম দিয়ে দেবরের সাথে কথা বলে সে। মিন্টু ফোন করে তার ভাইকে মেরে ফেলার কথা জানায় কাজলকে। এরপর কাজল গ্রামীণফোনের সিমটি ফেলে দেন। কান্নাকাটি করে কাজল বাড়ির সবাইকে বলেন, ২০ হাজার টাকা নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন মনির। ছিনতাইকারীদের হাতে এ ঘটনার ঘটে থাকতে পারে বলে জানান কাজল। যদিও মনির মোটা অঙ্কের টাকা সাথে নেয়নি।
স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে কাজল রেখা দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে আহাজারি শুরু করেন। অপরদিকে, ঢাকায় বড় ভাইয়ের রহস্যজনক মৃত্যুতে মিন্টু নিজেই বাড্ডা থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ভাবি ও দেবরের আহাজারি ও মামলা দায়ের ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার কৌশল ছিলো। এই কৌশলের প্রকৃত কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ঘাটন করে বাড্ডা থানা পুলিশ। কারণ জানার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাজল রেখাকে ঢাকায় ডেকে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে স্বামীকে হত্যার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন কাজল।
রংমিস্ত্রির কাজ করতেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার মনিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা মনিরুজ্জামান মনির। তার ও কাজল রেখার সংসারে রয়েছে দুই ছেলে। সংসারে সচ্ছলতার জন্য নিজের এলাকা ছেড়ে কাজ করতেন ফেনী জেলার খয়রা এলাকায়। কিন্তু গ্রাম থেকে দূরে থাকাটাই কাল হলো মনিরের জীবনে।
কাজলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত আজমল হক মিন্টুসহ ভাড়াটে খুনি আব্দুল মান্নান, সোহাগ ওরফে শাওন ও ফাহিমকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত দুইটি ছুরি ও নিহত মনিরের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন সেটটি। আজমল হক মিন্টু ঢাকার একটি সিকিউরিটি কোম্পানিতে কাজ করতেন।
ডিসি মোস্তাক আরো জানান, হত্যাকান্ডে জড়িতরা জানিয়েছে ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী মনিরকে রিসিভ করে মান্নান বাড্ডা এলাকার সাতারকুলের নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। এসময় তাদের সঙ্গে শাওন ও ফাহিম ছিলেন। প্রথমে ফাহিম ছুরি দিয়ে মনিরের গলায় আঘাত করেন। এরপরই মান্নান তার গলায় আরও একটি আঘাত করেন। তিনি মাটিতে পড়লে মনিরের পেটে উপর্যুপরি আঘাত করে শাওন তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।’ খুনের জন্য অগ্রিম পাওয়া ৩০ হাজার টাকার মধ্য থেকে মান্নান নেয় ১০ হাজার টাকা, ফাহিমকে দেয়া হয় ৫ হাজার টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার টাকা নেয় শাওন। বাকি টাকা পরিশোধের আগেই সবাইকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মিন্টুসহ তিন ভাড়াটে খুনি গুলশানের কড়াইল বস্তিতে বাস করতেন বলেও জানান তিনি।
Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ