গ্রামের নাম স্বর্গপুর | শহীদ ইমাম

Spread the love

গ্রামের নাম স্বর্গপুর
শহীদ ইমাম

কুমোরপাড়ার লাগ উত্তরে নাবাল জমি
তারপর, রবিখন্দের ওপাড়ে
ভরাবর্ষায় বিল, উনোবর্ষায় সবুজ ধানের ক্ষেত
এদিকের আকাশ অনেক বড়
কাফনের কাপড়ের মতো সাদা।

এ পাড়া কুমোরণীদের মতোই আটপৌরে
এদের গায়ের রং মেটে, দোমেটে
কুমোর নিত্যানন্দ বংশপরম্পরায় গড়ে মৃৎপাত্র মৃদঙ্গ মৃন্ময়ী
পূজারীদের কাছে এদের মৃন্ময়ী দেবী চিন্ময়ী
পোড়ামাটি জীবন এদের।

কুমোরপাড়ার পশ্চিমে কৈবর্ত পাড়া
এ পাড়ার উত্তর হিস্যা খাল- যুগীদারা
একদা এ খালে নাইয়রি নায়ের দোহার হতো জলপিপি শুঁশুক
উকুন মারার ফুরসত পেতো না মেছুনীরা
এখন বেলা পড়ে উঞ্ছ কুড়িয়ে।

গ্রামটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক কালপুরুষ
হাজার বছরের হাসি-কান্না পালাবদলের সাক্ষি
কালপুরুষ বটগাছটার পায়ের কাছে অনার্যরা নিবেদন করে মানতের ছাগল ভেড়া
অন্ধকার গাঢ় হলে অশরীরীরা আসেন
নিয়ে যান নৈবেদ্য- কাটে ফাঁড়া।

ভেজা চুলের টেড়ির মত গ্রামটাকে দুভাগ করেছে বড় রাস্তা
সদরে যাওয়ার- পূব-পশ্চিমে, করেছিল হেরিকেন আর পাঞ্জায়
কালপুরুষ থেকে একটু দক্ষিণে খেজুরতলায় এসে পূবে নেমেছে গোবাট
পূবপাড়াকে দুভাগ করেছে উত্তর-দক্ষিণে
গেছে আশামরি- আড়ং ঘাটায়।

আর একটু দক্ষিণে এসে
পশ্চিমে নেমেছে পায়ে চলা আঁকাবাঁকা পথ
সুতার সুরেশের বাগ, রায়দীঘি, ভট্টবাড়ি হয়ে গেছে পালবাড়ি নাট্যমঞ্চে
আমাদের এ নাট্যমঞ্চ তোমাদের মহানগর থেকে প্রাচীন
প্রাচীন মথুরা বৃন্দাবন থেকে।

এ নাট্যমঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে অসংখ্য নাটক- সামাজিক ঐতিহাসিক
শেক্সপিয়ার মাইকেলের জন্মের আগে পরে
সেসব নাটক দেখে কষ্টে কেঁদেছে, ক্ষোভে ফুঁসেছে আমাদের পূর্বপুরুষ
দীক্ষা নিয়েছে ফকির মজনু শাহ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু
উদ্বুদ্ধ করেছে সংগ্রামে, স্বাধীনতায়।

এ গ্রামে হাজার বছর জ্বলেছে অগণিত চিতা,
নরেশের ঠাকুর্দা আর নজিমের তস্য দাদা-নানার বুকে
যখন জেঁকে বসে আর্য উপনিবেশ, বন্দি করে চার্তুবর্ণের ঘেরাটোপে- করে আর্যেতর
কালে কালে আমরা হই পরবাসী নিজবাসে
হয়ে অচ্ছুত, অন্ত্যজ, পামর।

যারা পারেনি মেনে নিতে আচার অনাচারের
ছেড়েছে ঘর, হয়েছে ফেরার বিবাগি বাউল
ত্যাগের মহিমায় লুকোতে চেয়েছে ব্যর্থতার গ্লানি- হৃদয়ের রক্তক্ষরণ
নরক ভোগের জুজুর ভয়ে হয়নি ঐক্য পামরের
ছুঁড়ে ফেলতে পারেনি বর্ণবৈষম্যের সংবিধান ।

রাজনীতি অর্থনীতিতে স্বয়ম্ভর ছিল স্বর্গপুর
তাবৎ ফসলে হিস্যা ছিল মাহাতো পাহান লোহার ধীবরের
সাম্য ছিল মৈত্রী ছিল, ছিল মন-মিলনের সামাজিক স্বীকৃতি
হিন্দু বৌদ্ধ জৈন মুসলমানের বেসাতি শুরুর আগে
প্রাক-দ্রাবিড় আদি-অস্ট্রিক যুগে।

আসে হাজার বছরের গোলামি চুক্তি- আর্য পূজ্য অনার্যের
বর্ণাশ্রয়ী সংবিধানের ধারা উপধারায় শতধা বিভক্ত হয় বাঙালী
চলে ধর্মের লেবাসধারী ঠগ বর্গীর অবাধ লুন্ঠন
ওরা লুটে নেয় আমাদের গ্রামের সোনা রূপা
সেবাদাসী করে যোনি নাবালিকার।

আমরা বাঁচাতে চেয়েছি অবগুণ্ঠনে
আমাদের অন্তজা নাবালিকা ফুলকলিদের
ধন্য হয়েছি বাঁচিয়ে জাত-কূল-মান দিয়ে তিলাঞ্জলি
ঠেকিয়েছি ঠাকুরভোগ- বাল্য বিবাহে
সন্ধ্যা মালতি জরিনা ছখিনার।

আমাদের সোনাধান খেয়েছে বুলবুলি
আমরা খাজনা দিয়েছি সন্ধ্যা ছখিনার নূপুর-নোলকে
আমাদের দেবত্রে ওরা গড়েছে দুর্গ, মিনার, করেছে শিবাজী কীর্তন
পারে নি নিতে আমাদের মোরগঝুটি সূর্য
ঘাসের ডগার মুক্তো রাশি রাশি।

আমাদের গ্রামের নৈর্ঋত কোনে বনেদি পাড়া
বিশাল মজা দিঘী আর ইটসুরকির ধ্বংসাবশেষ
ভিরমি খায় আগন্তুক- এ কোন সভ্যতার রেশ! অগ্রজ হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর!
এ মাটির তলায় লুকোনো নেই তো যক্ষের ধন
নিকষিত হেম, কষ্টি পাথরের বিষ্ণু?

আমরা এসব নিয়ে একদম ভাবি না
আমরা ভাবি ইসরাইল সরহাদ১ ভাষ্কর পন্ডিতকে২ নিয়ে
জগৎশেঠ৩ উমিচাঁদের৪ মতো ঘুঘুদের নিয়ে
পাকা ধানের লোভে ওরা ফিরবে আবার?
কর্পোরেট মুনাফায় লুটবে স্বাধীনতা?

ওরা কেড়ে নিয়েছে আমাদের সেচের পানি
এখন আমাদের ক্ষেতে মুক্তো ছড়ায় গভীর নলকূপ
সোনা ঝরে আমাদের ধানের শীষে, মধু চোঁয়ায় সর্ষেফুলে
হীরা মতির দ্যুতি ছড়ায় পলাশ শিমুল
এগুলো ঠগ বর্গীর লপ্তের বাইরে।

বড় কোনো অঘটন ঘটেনি আমাদের গ্রামে
মধ্যস্থ করতে আসতে হয়নি কোনো ফিরঙ্গি সাহেবানের
বরাবর নিজেদের সালিসি নিজেরাই করি আমরা ছন্দানুগামী হয়ে সময়ের
কামার কুমোর মৌলভি মুন্সিরা
পারিনি সাতচল্লিশে, একাত্তরে।

একাত্তরে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়েছে আমাদের গ্রাম
আগুন ছাইচাপা ছিল সাতচল্লিশে, দেশ ভাগে- বাংলা ভাগে
বীজ বুনা ছিল বায়ান্ন’য়- বর্ণবৈষম্যের প্রেতাত্মা ভাষা বৈষম্যে- দাবানল নিভিয়েছে
রাজেন্দ্র চামার, দীনেশ কুমোর, জবান আলী আয়াত আলীরা
শাশ্বত মানবতার সোহাগস্পর্শে।

সোমেশ্বর ওঝা, ওসমান লেঠেল, দীজেন গয়াল
দীপ্ত পায়ে এগিয়ে যায় রণাঙ্গণ অভিমূখে
প্রকৃতির বারুদ- গোময় বোঝাই চাঙারি নিয়ে বাঙ্গী দুলিয়ে
অস্ত্রÑ দাদা তস্য দাদার রেখে যাওয়া লাঙ্গলের ঈষা
এরা লড়াই করে নিত্যদিন।

আমাদের গ্রামে দিঘীর মতো বড় অনেকগুলো পুকুর আছে
ঋতুমাফিক রঙ বদলায় এসব পুকুরের পানি
আমরা এ পানিতে সাফ করি সোনালি আঁশ, গবাদিপশু
ধোয়া-পাখলা করি ভাতের হাঁড়ি, কাঁথা-কম্বল, সারি সৌচকর্ম
অসূচি দূর করি অযু করে।

এসব পুকুরের পলির নিচে চাপা পড়েছে
মাসী পিসি দাদী নানীর হাজারো কিস্সা- রূপকথার
কিস্সা- পালা-পার্বনে তৈজসপত্রের জোগানদার সচল সিন্ধুকের
কিস্সা- পাতালপুরের রাজকন্যার, জলপরীর
যে কিস্সা শুনে স্বপ্নরা ডানা মেলত।

তোমরা এসবের তোয়াক্কা কর না
সোনার হরিণের খোঁজে লম্বা হচ্ছে তোমাদের ‘ব্যক্তিগত গলা’
ভুলে গেছ হাজার বছরের লুণ্ঠন- বর্গীর জমিদারের পিন্ডির
ভ্রষ্ট অতীতের কষ্টগাথা হয়েছে বাউলবিলাস
শ্রীজ্ঞানের দেশে তাই এখন হাসে ইতিহাস।

আমাদের গ্রামের মানুষগুলো অস্বাভাবিক সরল
আমরা গোগ্রাসে গরল গিলি- নীলকন্ঠের মতো
গিলি জমি দখলের টেটার আঘাত, দাঙ্গার কিরিচ, যুদ্ধের ক্ষত
সন্ত্রাস রাজনীতির, অর্থনীতির, ধর্মের
রাম আর রাজাকার তত্তে¡র।

পৃথিবী আমাদের খবর রাখে না
কিন্তু আমরা পৃথিবীর খবর রাখি
আমরা যেমন জানি আমাদের গ্রামের সিঁধেল চোর কে
তেমনি জানি তোমাদের কারা ভোট চোর শেয়ার চোর
আমরা ‘মমি’ করে রাখি ইতিহাস।

সুঢৌল স্তন নেই আমাদের মায়েদের
কিন্তু মিয়ানো স্তনের চুঁচি চুষে
তড়বড় করে বেড়ে ওঠে আমাদের সন্তান- বংশানুক্রমে
আমাদের মিষ্টি আলু আয়রনে ঠাসা
এ গ্রামে প্রতিবন্ধী নেই।

আমাদের বিলে ফি-বছর অবমুক্ত হয় উন্নত জাতের পোনা
বিল-খাল-নদী হয়ে সাগর পাড়ি দেয় অনায়াসে
এদের ঘাই দেখে থমকে দাঁড়ায় বিদেশী নাবিক- খোঁজ নিয়ে জানে
এশিয়ার যোনি নিঃসৃত ব-দ্বীপের স্বর্গপুর গ্রামে বহাল তবিয়তে আছে
এক অনাদি অনন্ত হ্যাচারি।

১. ইসরাইল সরহাদ: আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী। কোলকাতা, সুতানটি ও গোবিন্দপুরের জমিদারী নামমাত্র মূল্যে কিনে নিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সাহায্য করেছিল।
২. ভাষ্কর পন্ডিত: মারাঠা লুণ্ঠরকারী রঘুজী ভোসলার প্রধান সেনাপতি।
৩. জগৎশেঠ: মারওয়াড়ী ব্যবসায়ী। স্বীয় আর্থিক প্রতিপত্তির মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলার সার্বভৌম ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে।
৪. উমিচাঁদ:শিখ ব্যবসায়ী। তার আর্থিক প্রতিপত্তি ও কূটকৌশলের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলার সার্বভৌম ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ