মামলায় শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কায় সুবর্ণা নদীকে হত্যা !

Spread the love
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ক্রাইম ডট কম: সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন পাবনার সাংবাদিক সুবর্ণা আক্তার নদী ওরফে সুবর্ণা নদী (৩০), পরবর্তীতে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডিও করেছিলেন। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে ঢাকায় এসে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন। তারপরও রেহাই পেলেন না তিনি। কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গত ২৯ আগস্ট বুধবার পাবনা সদর থানায় তার সাবেক স্বামী রাজীব হোসেন ও শিল্পপতি শশুড় আবুল হোসেন, অফিস সহকারী শামসুজ্জামানের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৫/৬জনকে আসামী করে একটি মামলা করেন নদীর মা মর্জিনা বেগম। ইতিমধ্যে শিল্পপতি আবুল হোসেনকে গ্রেফতার করেছে থানা পুলিশ। বাকী আসামীদের গ্রেফতার করতে অভিযান চালাচ্ছে থানা পুলিশের কয়েকটি টিম।
জানা যায়, পাবনার স্থানীয় শিল্পপতি আবুল হোসেনের ছেলে রাজীবের সাথে প্রায় চার বছর পূর্বে বিয়ে হয়েছিল তার। স্বামীর একাধিক নারী প্রীতি ও লালসার ঘটনা জেনে তিনি বাঁধা দিয়েছিলেন, স্বামীবে বহুগামীতার পথ থেকে ফেরাতে না পেরে বাধ্য হয়ে পারিবারিক কলহে জড়িয়ে পড়েন। বছরখানেক আগে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়। পরবর্তীতে সাবেক স্বামীর যৌতুক দাবীর প্রেক্ষিতে পাবনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে একটি যৌতুক মামলা করেন সুবর্ণা নদী। ওই মামলায় সুবর্ণা তার সাবেক স্বামী রাজীব ও তার বাবা আবুল হোসেনসহ তিনজনকে আসামি করেছিলেন, ২৮ আগস্ট মামলার তারিখ ছিলো। মামলায় নিশ্চিত শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কায় সুবর্ণাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, ‘সংবাদকর্মী সুবর্ণা আক্তার নদী হত্যার ঘটনায় স্থানীয় ইড্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানি) ও শিমলা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নদীর সাবেক শ্বশুর আবুল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সংবাদ সংক্রান্ত কোনো ঘটনায় সুবর্ণাকে হত্যা করা হয়নি। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে তা হলো, তার পারিবারিক সমস্যা বা বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরো জানান, কিছু চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে, তবে তা তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। অতিদ্রত সময়ের মধ্যেই এর সাথে যারা জড়িত রয়েছে তাদেরকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সাংবাদিক সুবর্ণা আক্তার নদী দুর্বৃত্তদের হামলায় খুন হওয়ার এক বছর পূর্বে (২০১৭ সালের ২২ জুলাই পাবনায় এবং ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) কার্যালয়ে) জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার সাবেক স্বামী রাজীব হোসেন ও শ্বশুর আবুল হোসেনের হাত থেকে বাঁচতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। এ সময় সুবর্ণা নদী বলেছিলেন, স্বামী রাজীব হোসেন ও শ্বশুর আবুল হোসেনের ভাড়াটিয়া গুন্ডাবাহিনী তাকে নির্যাতন ও হত্যার চেষ্টা করছে। গত ২০১৬ সালের ৬ জুন পাবনার শহরের রাজীব হোসেনের সাথে ৫ লাখ ১ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় তার। একপর্যায়ে তার স্বামী রাজীব তার কাছে ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। যৌতুক দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তাকে প্রচন্ড মারধর করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের ৩১ মে স্বামী তাকে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরপর সুবর্ণা নদী বাদী হয়ে ৪ জুন পাবনা সদর থানায় নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। এছাড়াও পাবনা জজ কোর্টে যৌতুক আইনে সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন।
তিনি আরো বলেন, মামলা দায়েরের পর থেকে তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামী তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে সব মামলা তুলে নেয়ার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছেন। মামলা না তুলে নিলে তাকে হত্যারও হুমকি দেয়া হয়। রাস্তায় ভাড়াটিয়া গুন্ডা দিয়ে গলায় চাকু ধরে মামলা তুলে নেয়ার জন্য শাসিয়েছে। এ অবস্থায় তিনি প্রাণ বাঁচাতে পাবনা ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে এসেছেন। এই মামলার কারণেই সুবর্ণাকে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন নদীর বড় বোন চম্পা খাতুন।
চম্পা খাতুন জানান, আমার বোন মৃত্যুর আগে হাসপাতালে আমাদের সব কিছু বলে গেছে, তার সাবেক স্বামী রাজীবের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ৪ জুন মামলা করেছিলো। যা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ঘটনার দিন (২৮ আগস্ট) আদালতে শুনানি শেষে সাবেক স্বামী রাজীবের লোকজন নিশ্চিত ছিলেন যে তারা মামলায় হেরে যাবেন। এ কারণে তারা ফোনে ও লোক মারফত বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া অব্যাহত রেখেছিলো। আদালতে সুবর্ণা সাক্ষ্যও উপস্থাপন করেছিলো। তারা নিশ্চিত হেরে যাবে বলে আশঙ্কায় ছিলো, আর ফোঁস যাওয়ার ভয়েই সুবর্ণা নদীকে পূর্বপরিকল্পিত ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সুবর্ণা নদীর মা মর্জিনা বেগম মামলা দায়েরের পর সাংবাদিকদের জানান, তার মেয়েকে তার সাবেক শিল্পপতি শশুর আবুল হোসেন ও তার ছেলে রাজীব পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। আমার মেয়ে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আনন্দ টিভি ও টাইমস ২৪ ডটনেটের পাবনা জেলা প্রতিনিধি এবং স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক জাগ্রতবাংলার প্রকাশক ও সম্পাদক সুবর্ণা আক্তার নদীকে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টায় তার নিজ ভাড়া বাসা রাধানগর মহল্লার আদর্শ গার্লস হাই স্কুলের সামনে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সুবর্ণা নদী পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ড গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর মেয়ে। তার ৫/৬ বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বর্তমানে নিহতের লাশ ময়না তদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ