বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন: গ্রেফতারকৃতরা রিমান্ডে

Spread the love

বিশেষ প্রতিনিধি: বনানীর এফআর টাওয়ারে সংঘটিত আগুনের ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনায় মামলা দায়েরের পর দুইজন গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে গ্রেফতার হওয়া ওই ভবনের দুই মালিক বিএনপি নেতা তাসভীর উল ইসলাম ও প্রকৌশলী এসএমএইচআই ফারুককে রোববার আদালতে পাঠানো হলে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

এ সময় তাসভীর ও ফারুকের জামিন আবেদন নাকচ করে ঢাকার মহানগর হাকিম সাব্বির ইয়াসির আহসান চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে দায়েরকৃত মামলায় তাদেরকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের মধ্যে ফারুক হলেন ওই ভবনের জমির মালিক আর তাসভীর হলেন কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সভাপতি।

তিনি ওই ভবন পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তাসভীর কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি এফআর টাওয়ারের ২১ থেকে ২৩তলা পর্যন্ত তিনটি ফ্লোরের মালিক, ওই তিনটি ফ্লোরে কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অফিস। গত শনিবার রাতে বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মিল্টন দত্ত বাদী হয়ে ৪৩৬/৩০৪(ক)/৪২৭/১০৯ ধারায় বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের (মামলা নম্বর-৩৭) করেছেন। এতে আসামী করা হয় জমির মালিক এসএমএইচআই ফারুক, রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান ও ভবনের অপর মালিক ও বিএনপি নেতা তাসবিরুল ইসলামকে।

মামলা দায়েরের পর পরই শনিবার রাত সাড়ে ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল বারিধারার বাসা থেকে তাসভীরকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর রাত পৌনে ২টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে ভবন মালিক ফারুককে গ্রেফতার করে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যানকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র। বৃহস্পতিবার এফআর টাওয়ারে আগুন লেগে ২৬ জনের মৃত্যু এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ওই ভবনে যথাযথ অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা নেই। ভবনটি নির্মাণে নীতিমালা যথাযথভাবে অনসুরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের ৩২ নম্বর হোল্ডিংয়ের এফআর টাওয়ারে লাগা আগুনে ২৬ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হন। জমির মূল মালিক ছিলেন এসএমএইচআই ফারুক। জমিতে ২০০৫ সালে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে রূপায়ন গ্রুপ। এর দুই বছর পর ভবনটি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা হয়। আধাআধি মালিকানা হওয়ায় ভবনটির নাম দেয়া হয় ফারুক-রূপায়ন টাওয়ার; সংক্ষেপে এফআর টাওয়ার। পরে রূপায়ন গ্রুপ তাদের মালিকানায় থাকা বিভিন্ন ইউনিট বিক্রি করে দেয়। সব মিলিয়ে ২৩ তলা ওই ভবনের সবগুলো ইউনিটের মালিক এখন ফারুক ও তাসভীরসহ মোট ২৪ জন ব্যক্তি। তারা ভবনের বিভিন্ন ফ্লোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। তাসভীরুল ইসলাম কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। পাশাপাশি তিনি কাশেম ড্রাইসেলস কোম্পানি লিমিডেট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী কর্মকর্তা। এদিকে রাজউক সূত্র জানিয়েছে, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভবনটির ভূমি মালিক ইঞ্জিনিয়ার ফারুক ও রূপায়ন গ্রুপ যৌথভাবে নক্্শা অনুমোদনের জন্য আবেদন করে। তখন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ১৮ তলা ভবন নির্মাণের জন্য নক্্শা অনুমোদন দেয়। পরে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর ভবনটিকে ২৩ তলা পর্যন্ত বর্ধিত করে নির্মাণ করা হয়। ডেভেলপার কোম্পানি ভবনটির ২০ ও ২১তম তলাটি জাতীয় পার্টির প্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য মাইদুল ইসলামের কাছে বিক্রি করে। মাইদুল ইসলামের কাছ থেকে ফ্লোর দুইটি কিনে নেন কাশেম ড্রাইসেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিএনপি নেতা তাসভীর উল ইসলাম।

এরপর তিনি নক্্শা পরিবর্তন করে ছাদের ওপর আরও দুটি ফ্লোর নির্মাণ করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের সাথে তাসভীরের ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেই সুবাদে ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করলেও রাজউক কোনও বাধা দেয়নি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাসভীর একাদশ সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৩ আসনে (উলিপুর) বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। তাসভীর ২০০৬ সালে রাজনীতিতে আসেন। তবে তার বড় ভাই একেএম মাঈদুল ইসলাম বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। পরে এইচএম এরশাদের আমলেও মন্ত্রী হয়েছিলেন মাইদুল। দশম সংসদেও জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি।

এদিকে তাসভীর দাবি করে বলেন, ‘তার ফ্লোরগুলোর রাজউক অনুমোধিত বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। তিনি ফ্লোরগুলো রূপায়ন থেকে কিনেছেন। ভূমি মালিক আর ডেভেলপার কোম্পানির দ্বন্দ্বের কারণে এই ধু¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য তিনি দায়ী নন, দায়ী রাজউক।’ উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ২৩ তলাবিশিষ্ট বনানীর এফ আর টাওয়ারের ৯ তলায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট আগুন নেভানো ও হতাহতদের উদ্ধারের কাজ করে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, রেড ক্রিসেন্টসহ ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত অনেক স্বেচ্ছাসেবী কাজ করে। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর রাত ৭টায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ