ঘুষে বেহিসাবি হিসাবরক্ষক জহিরুল!

Spread the love

মো. জহিরুল ইসলাম ভুইয়া। ছিলেন সরকারি হাসপাতালের পিয়ন। ২০১৪ সালে তিনি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক (ক্যাশিয়ার) হন। এর পর থেকে তাঁর সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এর উৎস সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।

জহিরুলের বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দত্তগ্রামে। তাঁর বাবার নাম মো. সিরাজুল ইসলাম ভুইয়া। তিনি ছিলেন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ড বয়। গত জুন মাসে তিনি মারা যান। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জহিরুল ১৯৯৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের একটি সরকারি হাসপাতালে পিয়ন পদে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। সেখান থেকে ২০০৭ সালে নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হন। গত আট বছরে কয়েকবার বদলির আদেশ হলেও তিনি নান্দাইল ছাড়েননি। ২০১৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর হিসাবরক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পান।

ARE YOU LOOKING FOR YOUR OWN PIECE OF PARADISE?

Prominent Living Ltd is a premier licensed real estate company in Bangladesh with its own unique identity.

Ongoing Project | Prominent Tower
Location: Sector 3, Uttara, Dhaka, Bangladesh.
Type: Commercial Building | 01716 638059, 01726 265195

হাসপাতালের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছাড় করানোর নামে নিয়মিত অর্থ আদায় করেন জহিরুল। তাঁর হাতে নান্দাইল স্বাস্থ্য বিভাগের ২৬৬ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী, স্বাস্থ্য সহকারী ও চিকিৎসক জিম্মি। নানা অজুহাতে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকা কাটেন।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে জহিরুল দুর্নীতি করতেন। গত জুন মাসে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তাজুল ইসলাম খান বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। এর পর থেকে জহিরুলের নানা অপকর্ম, দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রকাশ হতে থাকে। বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গত ১৫ জুলাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাঠ কর্মচারীরা নতুন যোগ দেওয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অনুপম ভাট্টাচার্যকে বরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আবেদীন খান। সেখানে স্বাস্থ্য বিভাগীয় মাঠ-কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম টিপু অভিযোগ করেন, ‘এ উপজেলায় ৭৬ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী। জুনে প্রত্যেকের নামে চিত্তবিনোদন ভাতা আসে। কিন্তু ভাতা ছাড় করাতে মাথাপিছু ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা দাবি করেন ক্যাশিয়ার। যাঁরা ঘুষ দিতে পেরেছেন, তাঁরা ভাতা পেয়েছেন। অন্যদের টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত গেছে। ‘ মাঠকর্মী টিপু যখন এ অভিযোগ করছিলেন, তখন জহিরুল সভায় উপস্থিত থাকলেও টুঁ-শব্দটি করেননি। এ ছাড়া একজন নারী কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডারের (সিএইচপি) কাছ থেকে আগাম স্বাক্ষর রেখে বেতনের ১৬ হাজার ৭০০ টাকা দেননি হিসাবরক্ষক।

প্রকাশ্য সভায় দুর্নীতির অভিযোগ শুনে এমপি ঘটনা তদন্ত করার নির্দেশ দেন। গত মঙ্গলবার তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি অভিযোগকারীদের কাছ থেকে বক্তব্য সংগ্রহ করে। তদন্তস্থলে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, অভিযোগকারীরা কমিটির কাছে মৌখিক ও লিখিত বক্তব্য দেন।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অনুপম ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমি যোগদান করেছি এক মাস আগে। এর আগে যা ঘটুক না কেন, এখন সব কিছু নিয়মের মধ্যে হবে। দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না। তা ছাড়া গত মঙ্গলবার তদন্তদল ভুক্তভোগীদের ডেকে লিখিত বক্তব্য নিয়েছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। ’

অঢেল সম্পদ : কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, জহিরুল ইসলাম নান্দাইল পৌরসভার পাঁচপাড়া মহল্লায় নির্মাণ করছেন চারতলা একটি ভবন। ৬ শতাংশ জমির ওপর দোতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, এ এলাকায় জমির দাম কাঠাপ্রতি (১০ শতাংশ) ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা।

নান্দাইল হাসপাতাল মার্কেটে অবস্থিত ‘ল্যাবটেন’ নামের একটি রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে জহিরুলের মালিকানা রয়েছে। নান্দাইল পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে নির্মাণাধীন ভবনের দোতলায় ‘নান্দাইল প্রাইভেট হাসপাতালে’ রয়েছে মালিকানা। অন্যদিকে নান্দাইলে চাকরি করা কালে গ্রামের বাড়িতে প্রায় ৩০০ শতাংশ জমি নামে-বেনামে কিনেছেন। ফসলি জমি হলেও এর দাম প্রায় ৯০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ জেলা শহরের বলাশপুরে মুক্তিযোদ্ধা কলোনিতে সরকারি জমি পেয়েছেন জহিরুলের বাবা। জহিরুল ওই জমিতে তিনতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে একতলা বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করেছেন। দোতলার কাজ চলছে। ওই কলোনিতে বসবাসকারী দুজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘সরকারি জমি নিচু হওয়ায় গৃহনির্মাণের উপযোগী করতে তাঁদের ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। তার পরও সেখানে দালান নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ‘

গত শুক্রবার দত্তগ্রাম গ্রামে গেলে জহিরুলের কয়েকজন স্বজন দাবি করে, এসব জমিজমা অবসরভাতার অর্থ দিয়ে জহিরুলের বাবা কিনেছেন।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, জহিরুলের বাবা অবসরকালে এককালীন প্রায় ১৬ লাখ টাকা পেয়েছেন। আর জহিরুল মাসিক বেতন পান ১৩ হাজার ৪২৯ টাকা। তিন সন্তানসহ পাঁচজনের সংসার। তাঁর স্ত্রী গৃহিণী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেছে, ‘জহিরুল নান্দাইলে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করে। ‘

এসব বিষয়ে হিসাবরক্ষক জহিরুল ইসলাম ভুইয়া বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। স্বার্থ হাসিল না করতে পেরে একটি চক্র মিথ্যা অপবাদ ছড়াচ্ছে। ‘ পৌর শহরে নির্মাণাধীন ভবনের বিষয়ে বলেন, ‘পৈতৃক সম্পদ বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে এই ভবন নির্মাণ করছি। ল্যাবটেন ক্লিনিক ও নান্দাইল প্রাইভেট হাসপাতালের মালিকানা স্ত্রীর নামে। এসব বিনিয়োগের অর্থ স্ত্রীর। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো বিনিয়োগ নেই। আর ময়মনসিংহের মুক্তিযোদ্ধা কলোনিতে নির্মিত বাড়িটি বাবার। ‘

ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন মো. খলিলুর রহমান বলেন, ‘জহিরুলের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয় সম্পর্কে অবগত আছি। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ