শেরপুরে লাগামহীন ভাবে চলছে নৈশ্য কোচিং সেন্টার

Spread the love

শেরপুর. জেলা প্রতিনিধি : নীতিমালা রয়েছে, তবুও নেই কোন প্রয়োগ। লাগামহীন কোচিং সেন্টারগুলোকে
নিয়ন্ত্রণে সরকারী নীতিমালা উপেক্ষা করে শেরপুরের বিভিন্ন উপজেলাতে চলছে কোচিং বাণিজ্য। পাবলিক পরীক্ষার সময় সরকারের নির্দেশে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ রাখার
নির্দেশ উপেক্ষা করেই চলছে কোচিং। বাইরে ঝুলছে কোচিং বন্ধের নোটিশ, অথচ মূল
ফটক বন্ধ রেখে ভেতরে চলছে ক্লাশ। এই ঘটনা এখন ঘটছে প্রতিনিয়তই। নৈশ্য
কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের পাঠিয়ে ভালো ফলের আশায় যেমন দিন গুনছেন
অভিভাবকরা, ঠিক তেমনি নিরাপত্তার শঙ্কায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত। রাতে ঝড়ো হাওয়া,
আগাম সংকেত ছাড়াই ঝড় বৃষ্টি, নিয়মিত লোডশেডিং-এ অভিভাবকদের দুঃশ্চিন্তায়
যেন কুল নেই। বেশিরভাগ কোচিং সেন্টারে নেই নিরাপত্তা বেস্টনী, লোডশেডিং
চলাকালীন নেই তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা।
পরীক্ষাই লক্ষ্য নয়, সৃজনশীল ব্যক্তি পরিণত করার লক্ষ্যেই ‘জীনিয়াস কোচিং সেন্টার’। এমন
লোভনীয় স্লোগান সম্বলিত সাইন বোর্ড ঝুঁলিয়ে সরকারি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে
জীনিয়াস কোচিং সেন্টারের মত পাঞ্জেরী, সুইট হোম, এক্সিলেন্ট, অগ্নিবীণা,
এক্সট্রা কেয়ার, চ্যালেঞ্জ, প্রভাতি, মেধা সিঁড়ি কোচিং সেন্টার নামে শেরপুরের
ঝিনাইগাতীতে অনুমোদন ছাড়াই চলছে নৈশ্য (রাত্রিকালীন) কোচিং সেন্টার।
উপজেলার সরকারী-বেসরকারী বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে প্রত্যাশিত লেখাপড়া না হওয়ার
অজুহাতে ভালো ফলাফলের লোভ দেখিয়ে কোচিং এ ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা
হচ্ছে। এমনকি প্রাইভেট ও কিন্ডারগার্ডেন প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ শেষে স্কুল ভবনেই নৈশ্য
কোচিং সেন্টার চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের
শিক্ষকদের যোগসাজশেই গড়ে উঠেছে এসব কোচিং সেন্টার।
একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে বিভিন্ন
বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নাম বলে শিক্ষার্থীদের কোচিং এ আসায় উদ্বুদ্ধ করেন
কোচিং কর্তৃপক্ষ। উপজেলার বেশ কয়েকটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা
এসব কোচিং সেন্টারের সাথে জড়িত বলেও অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। সেইসাথে
স্কুলে ক্লাশ না করে কোচিং সেন্টারে পড়েই ভালো ফলাফল অর্জনের ভবিষ্যৎদ্বাণীও করছেন
কোচিং কর্তৃপক্ষ। তবে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে এসব বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি
হননি বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টারে জড়িত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের
শিক্ষকরা।
এছাড়াও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক নিজ বাড়ীতেই
প্রাইভেটের নামে চালিয়ে যাচ্ছেন কোচিং বাণিজ্য। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও
মাধ্যমিক শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ৩০ থেকে ৪০ জনের ব্যাচ করে
কোচিং পরিচালনা করছেন তারা। বিষয়ভিত্তিক এসব শিক্ষকদের “কদর” বেশি হওয়ায় ৩০
জনের ব্যাচে পড়েও মাসিক ৮শ থেকে ১হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে প্রত্যেক
শিক্ষার্থীকে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এসব কোচিং সেন্টার গুলোতে বিকেল ৫টা
থেকেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ¯্রােত নামে। বিদ্যালয় ও
কলেজের সমান্তরালে শ্রেণিকক্ষের মতো আয়োজন করে রাত নয়টা পর্যন্ত এখানে পড়ানো
হয়। কোচিং সেন্টার ছাড়াও প্রাইভেট মুখী শিক্ষার্থীও রয়েছে শত শত।
অগ্নিবীনা কোচিং সেন্টারে দশম শ্রেণি পড়–য়া শিক্ষার্থী মো. ইমন মিয়া বলেন,
‘বিদ্যালয়ের শ্রেণিতে প্রতিযোগীতা ও লেখা-পড়ার উন্নয়নে সে কোচিং সেন্টারে
পড়েন। এছাড়া তার (ইমন) শ্রেণিতে পড়–য়া সিংহভাগ শিক্ষার্থীরাই কোচিং এ
পড়াশোনা করেন।’ তার অভিবাবক মো. বাদল মিয়া বলেন, ‘বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো
পড়াশোনা না হওয়ায় এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের কারণে তার সন্তানকে
কোচিং সেন্টারে পড়ান তিনি।’
উপজেলার সদরের থানা রোডে অবস্থিত জীনিয়াস কোচিং সেন্টারের সাইনবোর্ডে
প্রদর্শিত মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে পরিচালকের নাম জানতে চাইলে মো. আব্দুস
সাত্তারের নাম বলা হয়। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার সাথে সাথে তিনি নিজে
পরিচালক নন বলে দাবী করেন। ফোনে তার (মো. আব্দুস সাত্তার) কাছে কোচিং সেন্টারের
অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমি নলকুড়া সরকারী
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি পাশাপাশি খন্ডকালীন ক্লাস নিয়ে থাকি।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এটিও রশিদা বেগম বলেন, ‘আমাদের
সকল শিক্ষককে কোচিং চালাতে নিষেধ করেছি। এখন যদি কোন শিক্ষক কোচিং খুলে
থাকেন তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘নাইট কোচিং এর
ব্যাপারে আমরা জানতাম না। বিস্তারিত জেনে পদক্ষেপ নেব।’
এ ব্যাপারে শেরপুর জেলা প্রশাসন ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, যেসব শিক্ষক
পাঠদানে অবহেলা করে কোচিং এ সময় ব্যায় করছে সেটি অনৈতিক কাজের সাথে লিপ্ত
এবং এবিষয়ে সরকার আমাদের উপর কোন নির্দেশনা দিলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা
নিতে পারবো। কোচিং সেন্টার বন্ধে অভিভাবক, শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের
একসাথে এগিয়ে আসতে হবে, সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ