সদ্য প্রাপ্ত
রাজধানীতে ডিবি পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১ লাখ পিস ইয়াবাসহ ৪ মাদক সম্রাট গ্রেফতার গোপালগঞ্জে ৫ কেজি গাঁজাসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার ঝিনাইগাতীতে খাদ্যগুদামের নিরাপত্তা প্রাচীর সংস্কারে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ যশোরে র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ৩ মাদক ব্যবসায়ী নিহত যশোরে গনপিটুনিতে এক ডাকাত নিহত কাশিয়ানীতে রাজপাট কলেজে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ৫০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ বেনাপোল সীমান্ত থেকে ২৩ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার কুষ্টিয়ায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শীর্ষ সন্ত্রাসী হামিদুল বাহিনী প্রধান হামিদুল নিহত রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বিদেশী পিস্তল-গুলিসহ আটক ১ গোপালগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত-১

আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ নিতেই বাড্ডায় ডিশ-ব্যবসায়ীকে হত্যা

Spread the love

মো মাহমুদ হোসাইনঃ  ডিশ ব্যবসা ও এলাকার আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ নিতে রাজধানী বাড্ডার ডিশ-ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বাবুকে (৩০) মালয়েশিয়ায় বসেই হত্যার পরিকল্পনা করে একটি গ্রুপ। ওই গ্রুপের প্রধান রবিন ও তার দুই সহযোগী ডালিম ও ঘাতক স্বপন মিলে বাবুকে দুই দফায় হত্যার পরিকল্পনা করে। গত তিন-চার দিন আগে একবার ডিশ-ব্যবসায়ী বাবুকে মারার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। কিন্তু সে দিন মিশন সফল করতে পারেনি বলে জানায় সূত্রটি।

এরপর গত বুধবার রাতে রবিন গ্রুপের সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে ডিস-ব্যবসায়ী বাবুকে। মোটরসাইকেলে থাকা তিনজনের মধ্যে সাফায়াত তামরিন ওরফে তানভীর ওরফে রানা বাবুকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। এ দিকে এ হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তাদের মধ্যে তানভীরকে নিয়ে অভিযানে গেলে গোয়েন্দা পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় তানভীর। গ্রেফতার অপর দুই জনের সম্পৃক্ততা এখনও পাওয়া যায়নি।

ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ বাড্ডা এলাকায় ডিশ ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করছিল ডিশ বাবু। ওই এলাকার ডিশ ব্যবসায় দখলে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সন্ত্রাসী রবিন গ্রুপ। রবিন গ্রুপের গডফাদার হলো মেহেদী গ্রুপ। মেহেদী আমেরিকায় থেকে বাড্ডা এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কলকাঠি নাড়ছেন। রবিন গ্রুপের প্রধান রবিন মালয়েশিয়ায় থাকেন। সেখান থেকে বাড্ডার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এ এলাকার বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে মেহেদী গ্রুপ। এসব গ্রুপের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি। বাড্ডা, ভাটারা ও গুলশান এলাকার ডিশ ব্যবসা এককভাবে বাবুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডিশ বাবুর নিয়ন্ত্রণ থেকে এই ব্যবসা মালয়েশিয়া প্রবাসী রবিন নিয়ন্ত্রণ নিতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছিল। রবিন কোম্পানি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে। ঢাকায় তার সহযোগীরা হলো ডালিম, রমজান, তানভীর, হেলাল, শুভ, সাফায়াত তানভীর ওরফে রনি ও অভি।’

এই কর্মকর্তা বলেন, রবিনের এসব এলাকা থেকে অবৈধ কোনও আয় হচ্ছিল না। তাই ঢাকায় থাকা তার সহযোগীদের বাবুকে হত্যার নির্দেশ দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কোম্পানি গ্রুপ কাজ শুরু করে। গত রবিবার শুভ, সাফায়াত তানভীর, সোহেল ও রাসেলসহ আরও কয়েকজন গুলশানে বসে পরিকল্পনা করে। গুলশানের কমার্স কলেজের সামনে থেকে ওই দিন শুভর কাছ থেকে সাফায়াত তানভীর, হেলাল ও অভি অস্ত্র নিয়ে বাড্ডায় আসে। তবে, সেদিন বাবুকে তারা হত্যার সুযোগ না পেয়ে চলে যায়।

তিনি বলেন, দুই দিন বিরতি দিয়ে ফের হত্যার পরিকল্পনা করে। বুধবার শুভ নিজেই বাবুর অবস্থান নিশ্চিত হতে বাড্ডায় যায়। বিকাল তিনটার দিকে তানভীর, হেলাল ও অভি একটা মোটরসাইকেলে করে বাড্ডায় আসে। তারা রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় ঘোরাঘুরি করে। রাত ৯টার দিকে জাগরনী ক্লাবের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে ঢুকে পড়ে তারা তিন জন। আগে থেকে সেখানে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা রতন, টুটুল ও কবিরের সঙ্গেই ছিল ডিশ বাবু। তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে তানভীর ও হেলাল। এসময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাবুকে গুলি করে তারা মোটরসাইকেল নিয়ে ফের পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিছু দূর গিয়ে তাদের মোটরসাইকেল ভাঙ্গা রাস্তায় আটকে বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিন জন তাদের কাঁধের ব্যাগে অস্ত্র লুকিয়ে হাতিরঝিলের দিকে হাঁটা শুরু করে। কিছু দূর যাওয়ার পর জুয়েল নামে বাড্ডার স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা তানভীরকে দেখে চিনে ফেলে। সে তাকে ঝাপটে ধরে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয়রা তানভীরকে ধরে ফেলে। অভি ও হেলাল পালিয়ে যায়। এসময় সোহেল ও রাসেল নামে আরও দুই তরুণকে ওই এলাকা থেকে ধরে স্থানীয়রা। পরে ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তানভীর, সোহেল ও রাসেলকে গ্রেফতার করে। রাতভর তানভীর, সোহেল ও রাসেলকে আলাদাভাবে ও মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি জানতে পারে সোহেল ও রাসেল উৎসুক জনতা ছিল। তারা সেখানে মারামারি দেখে ভয়ে দৌড় দিলে জনতা ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তাদের একজনের বাবা চা বিক্রেতা আরেকজনের বাবা গাড়ি চালক। তানভীরও তাদের চেনে না বলে জানায়। এরপর ডিবি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়, তারা দুই জন বাবু হত্যার সঙ্গে জড়িত না।

জাগরনী সংসদের ম্যানেজার মো. জামাল জানান, ক্লাবের নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। বুধবার রাতের ঘটনার সময় আমি সেখানে ছিলাম না। ঘটনা শুনে আমি এখানে আসি। পরবর্তীতে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পুলিশকে হস্তান্তর করেছি। তিনি জানান, পুরো জাগরনী সংসদের ভেতরে ও বাইরে ৯টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, প্রায় ১ মিনিটের এই কিলিং মিশনের তিন অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে করে ক্লাবের ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় গেইটটি খোলাই ছিল। সড়কে মানুষের চলাফেরাও ছিল স্বাভাবিক। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল অভি। মাঝে হেলাল এবং পেছনে বসা ছিল তানভীর। তাদের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরা ছিল। ক্লাব মাঠে গিয়ে মোটরসাইকেল থামিয়ে গুলি চালায়। এতে ওই সময় ক্লাবের ভেতরে থাকা কয়েকজন দৌড়ে বের হতে দেখা যায়। ঠিক ৯টা ৫ মিনিটে কিলিং মিশন শেষ করে খুব স্বাভাবিকভাবেই তানভির হেঁটে হেঁটে গেটের সামনে আসেন। ওই সময় সে তার হাতে থাকা পিস্তলটি নাড়িয়ে কোমরে লুকিয়ে বের হয়। বাকি দুই জন মোটরসাইকেল নিয়ে গেটের কাছে এলেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেখানে দ্রুত ২ থেকে ৩ বার কিক মারতেই মোটর সাইকেল চালু হয়। বের হওয়ার সময় মোটরসাইকেলে দুই জনকে দেখা যায়।

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান বলেন, সাফায়াত তানভীরকে রাতে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিবি জানতে পারে, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী রবিন। তার আরও সহযোগী রয়েছে আফতাব নগর এলাকায়। এরপর তানভীরকে নিয়ে অভিযানে যায় ডিবি পুলিশ। সেখানে যাওয়ার পর তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশও পাল্টা গুলি করলে তানভীর গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে বাড্ডা থানা পুলিশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভোর ৫টার দিকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রানাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে দুইটি পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।
তিনি জানান, তানভীরের বাড়ি বরিশালে। সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করেছে। বিয়েও করেছে। তার স্ত্রী সাভারে থাকে। ঢাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড করে সে সাভারে চলে যায়। ঢাকায় শুভর কাছে তাদের অস্ত্র থাকতো।

পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা, একাধিক অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ অন্তত ৮/১০ টি মামলা রয়েছে। তার মামলার বিষয়ে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে। নিহত আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ডিশ বাবুর লাশ ময়নাতদন্ত শেষে তার বাবা মো. ফজলুর রহমান লাশ নিয়ে গেছেন। ফজলুর রহমান স্থানীয় একটি স্কুলের নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, তানভীরই বাবুকে হত্যা করে। তবে এর আগে কখনও কোনও দ্বন্দ্বের কথা শুনিনি।

নিহত ডিশ ব্যবসায়ী বাবুর শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ। এদিকে, ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত তানভীরের স্বজনরা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ মর্গে আসেননি তার লাশ নিতে।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক রাজধানীর বাড্ডা এলাকার খুনোখুনি বেড়ে গেছে। গত ২২ এপ্রিল বাড্ডার বেরাইদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই কামরুজ্জামান দুখুকে ভাগ্নে ফারুক আহমেদের গ্রুপ প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। এর আগে ২০১৪ সালের ৩ মে বাড্ডা জাগরণী কাবের ভেতর বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মোফাজ্জল হোসেন রাহিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট রাতে বাড্ডার আদর্শনগর পানিরপাম্প এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বাড্ডার ছয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শামসুদ্দিন মোল্লা, ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ মানিক, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামা এবং যুবলীগ নেতা আব্দুস সালাম। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দিনে দুপুরে মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তে ঢুকে রবিন গ্রুপের নির্দেশনায় আবুল বাশার নামে আরেক সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় কিলার নুরাকে অস্ত্রসহ আটকের পর পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলি ও বোমা ছুড়ে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মামুনকে। চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে গত ৫ বছরে বাড্ডায় খুন হন সাইদুর, মাসুম, আলা, রুবেল ও তাইজুলসহ আরো কয়েকজন।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ