basic-bank

মধ্য শ্রাবণেও জেলেরা ঘাটে

ফকির মাঝির মন এবার একেবারেই ভালো নেই। বঙ্গোপসাগরে সপ্তাহের খাটুনি সেরে সবে মাছঘাটে ফিরেছেন তিনি। প্রায় জলেই গেছে পরিশ্রম। শিকারে গিয়ে সামান্য ইলিশ নিয়েই ফিরতে হয়েছে তাকে। শনিবারই ইলিশ নিয়ে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ও মহিপুর আর বরগুনার পাথরঘাটায় ট্রলার ভেড়ালেন জেলেরা। কিন্তু তাদের অনেকেই হতাশ। কারও ৬০ কেজি, কারও মেরে কেটে প্রায় এক মেট্রিক টন ছুঁই ছুঁই। সাত দিনের শিকারে তার বেশি ইলিশ কারও জোটেনি। তবে এখনই জেলেরা নিরাশ হচ্ছেন না জেলেরা। তাদের আশা, আরও একটু বৃষ্টি হলে হয়তো বদলাতে পারে চিত্রটি।

বঙ্গোপসাগর তীরের জেলেরা বলছেন, গত বছর মধ্য আষাঢ়ে এক একটি ট্রলারে পর্যাপ্ত ইলিশের দেখা মিলেছিল।

এবার ছবিটা পুরোপুরি উল্টো। রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজের এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের ফকির মাঝি। তিনি বলেন, ‘আষাঢ়ের শুরুটাই খারাপভাবে হলো। গত বছর মৌসুমের শুরুতেই অনেক মাছ শিকার করেছিলাম। কিন্তু এবার তা হলো না। ‘ প্রায় এক মেট্রিক টন মাছ ধরেছেন ওই ট্রলারের মাঝিরা। তবে অনেকেই ফিরেছেন প্রায় শূন্য হাতে। চরমোন্তাজের জেলেরা বলছেন, ইলিশের দেখা নাই! কবে আসবে, তাও কেউ বলতে পারছেন না। জানতে চাইলে জেলেদের মুখে একটাই উত্তর, ‘ইলিশের কোনো খবর নেই’।ইলিশ নিয়ে গবেষণা করে এমন প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিশ। উপকূলের ৯টি জেলায় ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা জেলে এবং আড়তদারদের সঙ্গে সর্বাক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। জেলে এবং আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে তারা জানাচ্ছেন, ভাদ্রেই ইলিশ ধরা পড়বে। কারণ বিগত বছরেও এই ভাদ্রেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়েছিল। তাছাড়া এ পর্যন্ত জেলেদের জালে যে মাছ আটকা পড়েছে, তার মধ্যে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ হচ্ছে ১০ থেকে ২০ শতাংশ, এক কেজির নিচে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং এক কেজির বড় সাইজের পাঁচ থেকে ২৫ শতাংশ। এই চিত্রই বলে দিচ্ছে আগামীতে ইলিশ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়বে।

এদিকে, ভ্যাপসা গরমের হাত থেকে রেহাই দিয়েছে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি। বর্ষার জল গায়ে পড়তেই শুরু হয়ে গেছে ইলিশের খোঁজ। অবশ্য বিভাগীয় শহরের কোনও বাজারেই তার তেমন দেখা মেলেনি। প্রতিদিনই বাজারে বড় আকারের ইলিশের খোঁজ করেছেন অনেকে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। পাইকারি মাছের বাজারের ব্যবসায়ীরাও বলতে পারছেন না, কবে ইলিশ ঢুকবে। মৎস্যজীবীরা জানাচ্ছেন, মোহনায় বৃষ্টির মিষ্টি জলের সঙ্গে পূবালি হাওয়া বইতে শুরু করেছে, জালে ইলিশ ধরার পক্ষে যা আদর্শ। তবে রসনা তৃপ্তির জন্য আরও কিছু দিন সময় লাগবে। অনেকেরই আশা ছিল, এবার ইলিশের জোগানও যথেষ্ট থাকবে।

অপরদিকে, পাথরঘাটার জেলেরা বলছেন, প্রতিবছরই আষাঢ়ের বৃষ্টিতে বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশের ঝাঁক ছোটে মোহনার উদ্দেশে। সাগরে দিনরাত খেটে জাল পেতেও তেমন একটা ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা। অথচ দুই বছর আগেও জ্যৈষ্ঠ মাস থেকেই ইলিশের বেচাকেনায় সরগরম হয়ে উঠত চরমোন্তাজের আড়তগুলো। গত বছরগুলোতে আড়তে প্রতিদিন শত শত মেট্রিকটন ইলিশ আমদানি হতো। এ বছর চরমোনতাজের আড়তগুলো যেন ঝিমোচ্ছে। জেলেরা বরগুনার পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর মহিপুর, পিরোজপুরের পাড়েরহাট মৎস্যবন্দরসহ উপকূলবর্তী বেশিরভাগ এলাকাতেই একই হাল। জলবায়ুর পরিবর্তনের পাশাপাশি ডুবোচর আর নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াকেই ইলিশ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইলিশের হাহাকার রয়েছে মৎস্যবন্দর পাথরঘাটায়। দুই নদীর মোহনায় এবার জাটকা নিধন বন্ধ কার্যক্রম সফল হওয়ার কথা বলা হলেও ইলিশ ধরার পরিমাণ খুব একটা বাড়েনি। ছোটবড় মাছঘাটগুলো ঘুরে দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। এই সময় প্রতিদিন আমদানি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ ইলিশ। তবে এই ঘাটে মূলত উপকুলের বিভিন্ন স্থান থেকে ইলিশ আসে। সেই ইলিশ সড়ক পথে চলে যায় ঢাকার পাইকারি বাজারগুলোতে। সেখানেও ইলিশের পরিমাণ খুবই কম। জেলেরা ৫০ হাজার টাকা খরচ করে সাগরে গিয়ে মাছ পাচ্ছেন তার অর্ধেক টাকার। তাই সেখানকার জেলেরাও সাগরে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।

জেলেরা যা বলছেন: পাথরঘাটার এফবি সোনামুখী ট্রলারের শ্রমিক অসিত দাসেরও একই অভিজ্ঞতা। তাদের ইলিশ জুটেছে ৬০ কেজির মতো। তার কথায়, ‘খাটুনি পোষায়নি। সেরকম ইলিশ না মেলায় কিছু অন্য মাছ ধরে নিয়ে আসতে হয়েছে। ‘ জুলাইয়ের শেষ দিকে মাছ ধরতে গিয়েছিল প্রচুর ট্রলার। শনিবার বিকেলে পাথরঘাটায় ফিরে আসে প্রায় ৪০টি ট্রলার। সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই মেট্রিক টনের কাছাকাছি ইলিশ উঠেছে বলে জানান মৎস্যজীবীরা। কিন্তু গতবার ১২-১৫ মেট্রিক টনের কাছাকাছি ছিল।

পাথরঘাটা থেকে প্রায় এখনও বেশিরভাগ ট্রলারই রয়েছে গভীর সমুদ্রে। তাদের ফিরতে আরও তিন-চার দিন লাগবে। চিত্রটা তখন আরও পরিষ্কার হবে বলে জানাচ্ছেন মৎস্যজীবীরা। মৎস্য দপ্তরের কর্তারাও পরিস্থিতির ‌ওপর নজর রেখে চলেছেন। মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষার শুরুতে প্রচুর বৃষ্টি হলেও ইলিশের জন্য পরিস্থিতি খানিকটা অনুকূল থাকে। এবার সেটা তেমন নেই। টানা বৃষ্টি হচ্ছে, আবার খরাও হচ্ছে। তা ছাড়া ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হচ্ছে গভীর সমুদ্রেও। শেষ শ্রাবণে পরিস্থিতি বদলাতেও পারে।

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘এখন ইলিশের আকাল। এমন চললে কয়েক বছর পর বঙ্গোপসাগরে হয়তো অন্য মাছও পাওয়া যাবে না। ‘ পাথরঘাটার রুহিতা গ্রামের বাসিন্দা ট্রলার মালিক নূরে আলম বলেন, ‘মাঝিসহ জনা বারো কর্মীর বেতন, জ্বালানি খরচ, সব মিলিয়ে একবার সমুদ্রে ট্রলার পাঠাতেই অনেক খরচ। ইলিশের সংকট হলে ট্রলার চালানো দায় হবে। ‘ নূরে আলমের মতে, বর্ষা ঢুকেছে, কিন্তু সাগরে বৃষ্টিটা সেরকম হচ্ছে না। তা ছাড়া কয়েকদিন ধরে পূবের হাওয়ার বদলে পশ্চিমার দাপট বেশি। এ কারণেই এখনো পরিস্থিতি ইলিশের জন্য মৎস্যজীবীদের কাছে অনুকূল হয়নি।

বিশেজ্ঞরা যা বলছেন
ইলিশ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. আবদুল ওহাব। ইউএস এইডের অর্থিক সহযোগিতায় ওয়ার্ল্ড ফিশের আওতাধীন ইকোফিশ বাংলাদেশ প্রকল্পের টিম লিডারের দায়িত্বে থাকা ওহাবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন এ আকাল? তার মতে, ‘ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। ইলিশ ধরাও পড়ছে। সেই ধরা পড়া ইলিশের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কম। কিন্তু ২০১৪ কিংবা ২০১৫ সালের তুলনায় বেশি। এই গবেষক আরো বলেন, “এ বছর বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে। তার অর্থ হচ্ছে ইলিশ ধরা নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে। তার জের ধরেও এ বছর মাছের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। কারণ বন্যা বেড়েছে। জেলেদের জালে বড় সাইজের ইলিশ ধরা পড়ছে। এই তথ্যই বলে দিচ্ছে এবারও ইলিশ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাবে। ”

বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা বজলুর রশীদ বলেন, ‘সমুদ্রে দূষণ বাড়ছে। কমছে বৃষ্টির পরিমাণ। পাল্লা দিয়ে ট্রলারের সংখ্যাও বাড়ছে। এই পরিবেশ ইলিশের জন্য মোটেও অনুকূল নয়। তা ছাড়া গভীর সমুদ্র থেকে ইলিশের মাইগ্রেশন বেশ কয়েকটি পরিস্থিতির বিবেচনায় হয়। তার মধ্যে জোয়ারভাটা, বৃষ্ঠিপাত, পানির প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। ‘ তিনি জানান, পাথরঘাটায় গত মঙ্গলবার সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। সেখানে আগের তুলনায় জেলেরা মাছ পাচ্ছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি মাছের সংকট কেটে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।