basic-bank

রক্তের ফেরিওয়ালা

‘আমার বোনের যখন ব্লাড ক্যান্সার হয়, তখন তার জন্য ৩০ দিনে ৩০ ব্যাগ রক্ত লাগবে বলে ডাক্তার জানান। বোনকে বাঁচাতে রক্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব-পশ্চিম গেটে বসে কান্নাকাটি করতাম। শেষ পর্যন্ত বোনকে বাঁচাতে পারিনি, সেই থেকে বুঝেছি মানুষের জীবনে রক্ত কী জিনিস। ‘ কথাগুলো রাউজান হিংগলা এলাকার মৃত আনোয়ার মিয়ার ছেলে মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাঈম উদ্দিনের (২৭)। ২০১৫ সালে ক্যান্সার আক্রান্ত তাঁর বোনটি মারা যায়। ডাবুয়া ইউনিয়নের মৃত এমদাদুল হকের ছেলে রাউজান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. সাইফুদ্দিন আহমদ সাইফ। তার জীবনের গল্পটিও প্রায় নাঈম উদ্দিনের মতো। তার বাবারও ছিল ব্লাড ক্যান্সার। ২০০৯ সালে সাইফের বয়স যখন ১৫, তখন জীবনের প্রথম তার বাবাকে রক্ত দেয় সে। ১৮ বছরের কম বয়সে রক্ত দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও ওজন ঠিক থাকায় বাবাকে বাঁচানোর স্বপ্নে পরিবারের অনুমতি সাপেক্ষে রক্ত দিতে বাধ্য হয় সে।

অল্প বয়সে দুজনের জীবনের দুই ট্র্যাজেডির পর এখন রক্তের ফেরিওয়ালা নাঈম আর সাইফ।

তখন থেকে তারা স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়ার কাজে লিপ্ত। এ পর্যন্ত দুজন রক্ত দিয়েছে ১৭ বার করে। শুধু নিজের শরীর থেকে রক্ত দেওয়ার মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ নয়, অন্যের জীবন বাঁচাতে রক্ত সংগ্রহও করে দেয় তারা। আর এ উদ্দেশ্যে তারা তৈরি করেছে রাউজানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘রাউজান ব্লাড ব্যাংক’। ১০ বন্ধু মিলে গড়ে তোলা এ সংগঠনের প্রচারণার কাজ চলে মূলত অনলাইনের মধ্য দিয়ে। সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত সবাই বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা ফেসবুকে ফ্রেন্ডস গ্রুপ করে রক্ত সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করে। উৎসাহ জোগায় রক্তদানে। তাদের ফেসবুক পেজে আছে ২৫ হাজার ফলোয়ার। সংগঠনের কার্যকরী সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে যুক্ত আছে ৭০ জন। তত্ত্বাবধায়ক আছে ২৫ জন। এ প্রক্রিয়ায় তারা এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষকে রক্ত দিয়ে সহায়তা করেছে। রাউজান এবং চট্টগ্রাম ছাড়াও ফেসবুক, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রক্ত জোগাড় করে দিয়েছে সংগঠনের সদস্যরা। এ ছাড়া গ্রামে গ্রামে বিনা মূল্যে ব্লাড ক্যাম্পেইন করেও মানুষের মধ্যে রক্তদানের উৎসাহ তৈরি করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাঈম ও কলেজছাত্র সাইফ বলল, ৭ নম্বর রাউজান ইউনিয়নের রমজান আলী হাট এলাকার সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী লিমন বড়ুয়া নামের এক তরুণ ২০১৫ সালের শেষ দিকে ‘রাউজান ব্লাড ব্যাংক’ নাম দিয়ে ফেসবুকে বন্ধু সার্কেল তথা গ্রুপভিত্তিক কাজ শুরু করেন। প্রবাসে থাকায় এ কাজটি বাস্তবায়ন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ওই ফেসবুক সার্কেলের সঙ্গে আমরা যুক্ত হলে মূল কাজটি আমাদের ওপর চলে আসে। এ পর্যন্ত আমরা রাউজানের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার মাঠপর্যায়ে ১৫টি ব্লাড ক্যাম্পেইন করেছি। এর মাধ্যমে প্রায় আড়াই শতাধিক নিয়মিত রক্তদাতা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৫০ জন এরই মধ্যে রক্ত দান করেছে। তবে স্থানীয়ভাবে যে রক্ত সংগ্রহ করা হয়, তা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও রেড ক্রিসেন্টে জমা দেওয়া হয়। এ ছাড়া গহিরা জেকে মেমোরিয়াল হাসপাতাল, নোয়াপাড়া পথেরহাটের পাইওনিয়র হাসপাতাল, কসমিক হাসপাতালের রোগীদের জন্যও রক্ত দেওয়া হয়। ব্লাড ব্যাংকটি এখন শুধু রক্তদাতা কিংবা রক্ত জোগানদাতা সংগঠন নয়, এটি এখন একটি সামাজিক সংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা রমজানে ইফতারসামগ্রী, পথশিশুদের ঈদ বস্ত্র, বন্যার্তদের ত্রাণ, বৃদ্ধদের বস্ত্র দেওয়াসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি।

এ ব্যাপারে রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা বলেন, ‘মানুষের সেবায় শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসায় সমাজ উপকৃত হচ্ছে। এভাবে সব শিক্ষার্থী কাজ করলে দেশ এগিয়ে যাবে। ‘ স্থানীয় সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীও শিক্ষার্থীদের এ কাজের প্রশংসা করেছেন। রাউজান ব্লাড ব্যাংকের উপদেষ্টা পর্ষদে রয়েছেন পৌরসভার প্যানেল মেয়র জমির উদ্দিন পারভেজ, ডাক্তার দীপক কুমার সরকার, অধ্যাপক এয়াকুব আলী, অধ্যাপক তসলিম উদ্দিন, ডা. স্বপ্না বড়ুয়া, আহসান হাবিব চৌধুরী হাসান প্রমুখ।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।